বহু বছর আগের ভালোবাসার গল্প

বহু বছর আগের ভালোবাসার গল্প

বহু বছর আগের ভালোবাসার গল্প টা তে আপনারা এমন একটা সময়ের ভালোবাসার কথা শুনতে পারবেন যেই সময় ছিলো না কোনো ইন্টারনেট আর ছিলো না কোনো স্মার্টফোন যা আজকের যুগে আছে। চলুন তাহলে শুরু করি আজকের valobasahr golpo যা আপনাদের ভালো লাগবে।

বহু বছর আগের ভালোবাসার গল্প

বহু বছর আগের ভালোবাসার গল্প
বহু বছর আগের ভালোবাসার গল্প

জেরিনের পরিবার আজকের নতুন বাসায় উঠছে। এক বাসা থেকে অন্য বাসায় ঘরের সব জিনিস পত্র নেয়া আবার গুছিয়ে রাখাটা যে কতোটা ঝামেলার সেটা হয়তো তারাই বুঝতে পারে যারা বাসা পাল্টেছে।

জেরিন নতুন বাসার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ওর প্রিয় পুতুল আর ওর সব জিনিস পাহাড়া দিচ্ছে। জেরিনের আম্মু বলেছিলো যে ওর কোনো জিনিসের কোনো ক্ষতি হবে না, কিন্তু জেরিন মানতে চায়নি। বিশেষ করে সে তার পুতুলটাকে একা রেখে উপরে নতুন ফ্লাটে যেতে চায়নি, তাই বাড়ির গেটের সামনে দাড়িয়েই পাহারা দিচ্ছে।

জেরিনের আম্মু বলে গেছিলো যে এই নতুন বাসার বাড়িওয়ালাদের একটা কাজের ছেলে আছে, উনি ঐ কাজের ছেলেকে পাঠাবে ওর জিনিস গুলো উপরে ওদের ফ্লাটে নিয়ে আসার জন্য।

একটু পরে একটা ছেলে বেড়িয়ে এলো বাড়ির গেট দিয়ে, ছেলেটার জামা কাপড়ে মাটি লেগে আছে।তবে ছেলেটা দেখতে একেবারে রাজপুত্রের মতো। জেরিন ছেলেটাকে দেখেই বললো,
জেরিনঃ এই ছেলে, এদিকে আসো।
ছেলেটাঃ জি! আমাকে বলছেন?

জেরিনঃ তোমাকে না তো আর কাকে বলবো! এই নাও এই বাক্সটা ধর। ( বেশ বড় একটা বাক্স ছেলেটার হাতে দিলো। ) আর পুতুলটা আমিই নিচ্ছি। চলো উপরে চলো।
ছেলেটা অবাক হলে বাক্সটা হাতে নিয়েই দাঁড়িয়ে রইলো। জারিন একটু রাগ করে ছেলেটাকে বললো, “এমন হা করে দাঁড়িয়ে আছো কেনো! উপরে নিয়ে আসো বাক্স, সাবধানে আনবে।“
ছেলেটা জেরিনের পেছনে পেছনে ওর সাথে উপরে চলে গেলো। ফ্লাটের ভেতরে যাবার পরে জেরিন ছেলেটাকে বাক্সটা রাখতে বলে এটা সেটা হুকুম দিতে থাকে আর ছেলেটাও জেরিনের কথা মতো কাজ করতে থাকে। হঠাত করে জেরিন বললো,

জেরিনঃ এই ছেলে তোমার নাম কি?
ছেলেটাঃ রাহিম।
জেরিনঃ চেহারাটা দেখতে তো বেশ সুন্দর ই, তা লেখাপড়া করা হয়েছে নাকি?
( ছেলেটা কথা না বলে মাথা নাড়িয়ে না বললো )
জেরিনঃ লেখাপড়া করোনি বলেই তো আজকে মানুষের বাসায় কাজের ছেলে হয়ে থাকতে হচ্ছে।

রাহিমঃ কাজের ছেলে!
জেরিনঃ কাজের ছেলে না তো কি? রাজপুত্র? ঐ বাক্সটাতে একটা আয়না আছে, বের করো আয়না টা।
রাহিম নামের ছেলেটির সাথে এভাবেই প্রথম দেখা হয় জেরিনের। জেরিনের বয়স ১৭ বছর। কলেজে পড়ছে। তবে কলেজটা পাল্টাতে হবে। এখন যেই কলেজে পরছে সেই কলেজ এই বাসা থেকে অনেক দূরে। এই বাসার সামনেই একটা কলেজ আছে। সেখানে নাকি এই বাড়ির মালিক ওকে ভর্তি করিয়ে দিবেন। যেহেতু কোনো কলেজেই অর্ধেক সময়ে কাউকে ভর্তি করাতে চায় না তাই একটু সুপারিশ লাগবে, সেটাই করে দিবে এই বাড়ির বাড়িওয়ালা।

যাই হোক, জেরিন আর রাহিম যখন ঘর গোছাচ্ছে তখন জেরিনের আম্মু ঘরে ঢুকে দেখে রাহিমের হাতে বাক্স আর জেরিন রাহিমকে এটা সেটা হুকুম করছে। রাহিম ও করে যাচ্ছে কাজ জেরিনের কথা মতো।

এমন দৃশ্য দেখে জেরিনের আম্মু তো আবাক!
জেরিনের আম্মুঃ এই জেরিন! কাকে কি বলছিস!
জেরিনঃ কাকে আবার কি বললাম!
জেরিনের আম্মুঃ চুপ থাক।
জেরিনের আম্মুঃ বাবা আমার মেয়েটার মনেহয় কোথাও ভুল হয়েছে তোমাকে চিনতে, তুমি কিছু মনে করো না। ( রাহিমকে উদ্দেশ্য করে )
রাহিমঃ না না আন্টি, ঠিক আছে, ব্যপারটা আমি আগেই বুঝতে পেরেছিলাম।
জেরিনঃ হচ্ছে টা কি! এই পিচ্ছি, ঐ বাক্সটা নিয়ে আসো, যাও।
জেরিনে আম্মুঃ চুপ! একদম চুপ! তুই জানিস ও কে! আর কাকে পিচ্ছি বলছিস! ও তোর থেকে ১ বছরের বড়।
জেরিনঃ ১ বছরের বড়! কি বলো! ওকে দেখে তো মনেহয় ১৪/১৫ বছর হবে। যাই হোক, ভাইয়া, ঐ বাক্সটা নিয়ে আসেন তো একটু।
জেরিন আম্মুঃ চুপ!

জেরিনঃ সেই কখন থেকে আমারে ধমক দিয়ে যাচ্ছো। হয়েছে টা কি!
জেরিনের আম্মুঃ ওর বাড়িওয়ালার ছেলে। তুই ওকে কি ভেবে হুকুম দিচ্ছিস আর কাজ করাচ্ছিস!
জেরিন তো এবার লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। মনে মনে ভাবছে, এটা বাড়িওয়ালার ছেলে! শার্টে ধুলোবালি, পেন্টে মাটি মাখা! কি অবস্থা!
জেরিনের আম্মুঃ বাবা তোমার জামাতে এতো মাটি লেগে আছে কেনো?
রাহিমঃ আসলে আন্টি আমি ছাদে ফুলের বাগান করার কথা ভাবছি, তাই ছাদে কাজ করতে গিয়ে মাটি লেগেছে।
জেরিনের আম্মুঃ ওহ। বাগান করলে তো ভালোই হবে। তোমাদের ছাদটা অনেক সুন্দর। সেখানে ফুল গাছ থাকলে আরো অনেক সুন্দর লাগবে।
রাহিমঃ জি আন্টি।

এমন সময় রাহিমের আম্মু আর আব্বু ( বাড়ির মালিক ) আসলেন নতুন ভারাটিদের কোনো অসুবিধা হচ্ছে নাকি সেটা দেখতে। এসে দেখেন রাহিম এই ফ্লাটে। জেরিন সালাম দিলো রাহিমের আব্বু আম্মুকে। তারা সালামের জবাব দিয়ে জেরিনের আম্মুকে জিজ্ঞেস করলো, এটাই বুঝি আপনার মেয়ে? জেরিনের আম্মু হ্যা বলে উত্তর দিলো।
রাহিমের আম্মুঃ কিরে তুই এখানে! তুই না বাইরের দোকানে গেলি কি জেনো কিনবি বলে। ( রাহিমকে উদ্দেশ্য করে )
রাহিমঃ হ্যা, তবে ওনাদের একটু help লাগতো, তাই একটু সামান্য help করছিলাম।
রাহিমের আম্মুঃ ভালো করেছিস। কিন্তু তোর জামা পেন্টে এতো মাটি কেনো!
রাহিমের আব্বুঃ তোমার ছেলে নাকি ছাদে ফুলের বাগান করবে তাই ছাদে মাটি দিয়ে কি জেনো করছে। আমাদের কাজের ছেলেটাকে দিয়ে মাটি নেয়াচ্ছে নিচে থেকে ছাদে।
রাহিমের আম্মুঃ ওহ!
তারপর রাহিমের আম্মু আব্বু, জেরিনের আম্মু আব্বু মিলে গল্প করতে থাকে আর রাহিম এবার নিজের ইচ্ছাতেই জেরিনকে সাহায্য করছে।

জেরিনঃ sorry ভাইয়া, আমি আপনাকে চিনতে পারিনি। আপনাকে দেখতে এতো অল্প বয়সের মনে হয়েছিলো আর জামাতে ময়লা ছিলো তাই আমি ভেবেছিলাম……
রাহিমঃ না না ঠিক আছে। তবে আমি মোটে ও অল্প বয়স্ক না। কলেজে পড়ছি।
তারপর আরো নানা বিষয় নিয়ে কথা বলতে থাকে জেরিন আর রাহিম। এভাবেই জেরিনের নতুন বাসায় প্রথম দিনটা শুরু হলো। রাহিম কিছু সময় জেরিনকে help করার পরে নিজেদের ফ্লাটে চলে গিয়েছিলো আর জেরিন মনে মনে রাহিমের কথা ভাবছিলো।

“ছেলেটা ছাদে ফুলের বাগান করবে! আমার অনেক ফুলের বাগান করার সখ। ভাইয়াকে বলবো নে আমাকে ও যেনো সাথে নেয় ওনার ফুলের বাগানে কাজ করতে। ছেলেটা খুব ভালো, আমাকে আজকে অনেক help করেছে। অন্য সব ছেলে হলে তো নিচে হাতে বাক্স ধরিয়ে দেয়ার সময় ই ধমক দিতো, কিন্তু রাহিম অনেক ভালো। না না, রাহিম না, রাহিম ভাইয়া। ভাইয়া বলতে কেমন যেনো লাগছে। যদিও লেখাপড়ায় আমার সমান তবে আম্মু তো বললো ১ বছরের নাকি বড়! থাক, ভাইয়া ই বলি।”

একদিন জেরিনের আম্মুর সাথে জেরিন ছাদে গেলো কাপড় রোদে দিতে। ছাদে গিয়ে দেখে যে অনেক সুন্দর কিছু ফুল গাছ লাগানো। ছাদের অর্ধেকটা ফাকা আর বাকি অর্ধেকটায় একটা বড় রুম আছে আর সাথে একটা বারান্দা। ঐ রুমের দরজাটা খোলা ছিলো, জেরিন ভেবেছিলো রুমটাতে হয়তো কেউ থাকে না তাই দরজা খোলা।

জেরিনের দেখতে ইচ্ছা করলো রুমের ভেতরে কি আছে, রুমের ভেতরে ঢুকে দেখে যে সেখানে একটা খাটে রাহিম গুমিয়ে আছে! আর রাহিমের খাটের সামনে অনেক বড় একটা কম্পিউটার। এতো বড় কম্পিটার যে আছে দুনিয়াতে এটা জেরিন আগে কখনো জানতো না।

জেরিন কিন্তু কম্পিটারের বেপারে অনেক কিছু জানে। কারন জেরিনের বড় ভাই কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। সুতরাং বুঝতেই পারছেন যে জেরিন যেহেতু কম্পিটারটা দেখে অবাক হয়েছে তার মানে যে কোনো সাধারন মানুষ রাহিমের কম্পিউটার দেখে অবাক হয়ে যাবার কথা।

যাই হোক, রাহিম ঘুমিয়ে আছে দেখে আস্তে আস্তে জেরিন রাহিমের সামনে গেলো। সেই দিন তো রাহিমকে ভালো করে দেখতেই পারেনি জেরিন। কারন প্রথমে তো কাজের ছেলে ভেবেছিলো, পরে সত্যিটা জানার পরে লজ্জায় চোখ মেলাতে পারেনি ও রাহিমের সাথে।
জেরিনের কেনো জেনো খুব ইচ্ছা করছে রাহিমের মাথা একটু হাত বুলিয়ে দিতে। এমন অদ্ভুত ইচ্ছা কেনো করছে জেরিনের সেটা হয়তো ও নিজে ও জানে না।

জেরিনের খুব ভয় করছে রাহিমের মাথায় হাত দিতে হবে সাহস করে কিভাবে জেনো রাহিমের মাথায় আস্তে আস্তে একটু হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো ঘুমন্ত রাহিমের পাশে বসে।
হঠাত রাহিমের ঘুম ভেঙ্গে গেলো! যে না রাহিম চোখ মেলে তাকালো ওমনি জেরিন তো ভয়ে কেপে উঠলো। দৌড়ে পালাতে চাইলো জেরিন, কিন্তু পারলো না, রাহিম ওর হাতটা ধরে ফেললো।

জেরিনঃ ভাইয়া please আমার হাতটা ছেড়ে দিন। কেউ দেখে ফেললে খারাপ ভাববে, আমার আম্মু ছাদেই আছে এখন।
রাহিমঃ ছাড়বো না। আগে বলো “আমি তোমাকে ভালোবাসি” তাহলে ছাড়বো।
জেরিনঃ মানে!
রাহিমঃ মানে আবার কি? যা বলেছি তা বলো তা না হলে কিন্তু আন্টিকে দাক দিবো, আন্টি নাকি ছাদেই আছে, আন্টি…….

জেরিনঃ এই না না না, ঠিক আছে ভালোবাসি।
রাহিমঃ এভাবে না, পুরোটা বলো, “আমি তোমাকে ভালোবাসি”
জেরিনঃ ( লজ্জা পেয়ে আস্তে আস্তে বললো ) আমি তোমাকে ভালোবাসি।
রাহিম এবার জেরিনের হাতটা ছেড়ে দিলো আর জেরিন এক দৌর দিয়ে চলে গেলো রুমের বাইরে।

তারপর কিছু দিন চলে গেলো, রাহিমের আম্মুর সাথে জেরিনের আম্মুর অনেক ভাব হয়ে গেছে। আর জেরিনের আব্বু আর রাহিমের আব্বু মিলে নতুন একটা ব্যবসা শুরু করছে। এককথায় বলতে গেলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দুটি পরিবার যেনো একটি পরিবার হয়ে গেছে।

কিন্তু জেরিন ভয়ে রাহিমদের ঘরেই যায় না। আর রাহিম ও মনে মনে রাগ করে আছে জেরিনের উপর। তখন তো আর ফেসবুকের মতো ওয়েবসাইট চালু হয়নি, তাই ইন্টারনেটের মাধ্যমে কথা বলার কোনো উপায় ও ছিলো না, উপায় শুধু একটাই, সেটা হচ্ছে মোবাইলে কথা বলা। কিন্তু জেরিনের তো মোবাইল নেই। তাই দেখা করা ছাড়া কথা বলার আর কোনো উপায় ছিলো না সেই সময়।

একদিন রাহিমে আম্মু জেরিনকে তাদের ফ্লাটে নিয়ে যায়। রাহিম ওর বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে। তাই ঘরে তেমন কেউ নেই কথা বলার মতো। রাহিমের আব্বু বাইরে আর রাহিমের আম্মু রান্না করছে। জেরিন একটু help করলো রাহিমের আম্মুকে রান্নার কাজে, আর এই জন্য রাহিমের আম্মুর খুব পছন্দ হয়ে গেলো জেরিনকে রাহিমের বউ হিসেবে।
আজকে রাহিমের আম্মু আর জেরিনকে দুপুরে না খাইয়ে ছাড়ছে না। সাথে জেরিনের আম্মু আব্বু আর ভাইকেও দাওয়াত দিলো দুপুরে।

রাহিমের আম্মু জেরিনকে বললো রাহিমের ঘরে গিয়ে ওর সাথে কথা বলতে। রাহিম নাকি সব সময় ই কম্পিউটারে কি জেনো করে। সারাদিন কম্পিউটার নিয়ে থাকে। তাই রাহিমের আম্মু জেরিনকে শিখিয়ে দিলো যে রাহিমকে মাঝে মাঝে সময় দিতে, বিশেষ করে ও যখন ছাদের রুমটায় গিয়ে কম্পিউটার চালায় তখন।

কারন রাহিম যখন একবার ছাদের রুমে গিয়ে কম্পিউটার চালানো শুরু করে তখন খাওয়া দাওয়া সব ভুলে সারা দিন কম্পিউটারে কাজ করতে করতে ঘুমিয়ে পরে।
যাই হোক, রাহিমের আম্মুর কথা মতো জেরিন গেলো রাহিমের ঘরে। দরজার সামনে গিয়ে বললো,
জেরিনঃ আসতে পারি?
রাহিমঃ ( একটু রাগি রাগি গলায় ) আসো।
( রাহিম কম্পিউটারে কি যেনো করছিলো, জেরনকে দেখে কাজ করা বন্ধ করে চুপ চাপ বসে আছে এক নজরের কম্পিউটারের মনিটরের দিকে তাকিয়ে। আগের দিনের কম্পিউটারের মনিটর তো ছিলো পুরানো দিনের টিভির মতো। )
জেরিনঃ আপনি কি রাগ করেছে আমার উপরে?
রাহিমঃ না।
জেরিনঃ তাই বুঝি?
রাহিমঃ একটা দিন ও আমার খোজ নিলে না। এ কেমন ভালোবাসা তোমার?
জেরিনঃ ওরে বাবা! বেশ রাগ করেছো দেখছি আমার উপর। sorry বাবু, আমি মেয়ে মানুষ হয়ে তোমার খোজ কিভাবে নিবো বলো।
রাহিমঃ আমি বাবু না, আমি বিজ্ঞানী।
জেরিনঃ ওরে বাবা রে আমার বিজ্ঞানী সাহেব। তা এই টিভির বাক্সের ভেতরে কি আবিষ্কার করেছেন আপনি শুনি?
রাহিমঃ এটা টিভির বাক্স না, এটা কম্পিউটারের মনিটর।

জেরিনঃ ঐ এক ই, দেখতে তো টিভির মতো ই, শুধু সাথে অতিরিক্ত কিছু তার দিয়ে আরো বড় একটা বাক্স যুক্ত করা। আমার ভাইয়ার ও একটা আছে, ভাইয়ার কম্পিউটারকে আমি টিভি ই বলি।

রাহিমঃ কেমন আছো?
জেরিনঃ হুহ, জানি না কেমন আছি।
রাহিমঃ আম্মু কিছু বলেছিলো তোমাকে?
জেরিনঃ কি বলবে?

রাহিমঃ বুঝেছি বলেনি। তোমার আম্মু কিছু বলেছিলো তোমাকে আমার ব্যপারে?
জেরিনঃ না, তেমন কিছু তো বলেনি, তবে জিজ্ঞেস করেছিলো তোমাকে আমার ভালো ছেলে মনে হয় কিনা। আমি তো বলে দিয়েছি, এক্কেবারে পচা ছেলে। ( আসলে বলেছিলো রাহিম খুব ভালো ছেলে )

রাহিমঃ আমাকে বিয়ে করবে?
জেরিনঃ ( লজ্জা পেয়ে আস্তে আস্তে বললো ) জানি না।
রাহিমঃ আজকে আমাদের বিয়ের পাকা কথা হবে, তাই তোমাদের পরিবারের সবাইকে দাওয়াত করা হয়েছে। আমি আব্বু আম্মু কে বলেছি তোমাকে আম্র খুব ভালো লেগেছে। আর আব্বু আম্মু ও তোমাকে আগে থেকেই অনেক পছন্দ করে।
জেরিনঃ কি বললে তুমি!!! ( অবাক হয়ে বললো )
রাহিমঃ কই! কিছু বলি নি তো!

তারপর দুজনে মিলে অনেক দুষ্টুমি করলো। তারপর জেরিনের আব্বু আম্মু ভাই আসলো, দুই পরিবার এক সাথে খাওয়া দাওয়া করলো। জেরিন আর রাহিম এই প্রথম একসাথে বসে খেয়েছে। যদি ও তাদের দেখা হয়েছে মাত্র ২ দিন আর আজকে নিয়ে ৩ দিন। আর ৩য় দিনেই ওদের বিয়ে ঠিক হলো।

জেরিন যেমন লজ্জা পাচ্ছে তেমন অবাক ও হয়েছে এতো তাড়াতাড়ি কিভাবে বিয়ে ঠিক হয়ে গেলো। আর মনে মনে তো মহা খুশি মনের মানুষ পেয়ে।

কিন্তু একটা খারাপ খবর আছে। বিয়ের দিন ঠিক হয়েছে আজ থেকে ৩ মাস পরে। আর এই ৩ মাস জেরিনের সাথে রাহিমের কোনো দেখা হবে না। আর জেরিন মোবাইলে ও কথা বলতে পারবে না।

কিছু দিন চলে গেলো, দুই পরিবারের সদস্যরা বিয়ের দাওয়াত দেয়া থেকে শুরু করে কেনাকাট গয়না বানানো নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে আর অন্যদিকে জেরিন আর রাহিম মন খারাপ করে আছে কারন একই বাড়িতে থেকেও তারা অনেক দূরে।

রাহিমের পরিবার থেকে জেরিনকে মোবাইল কিনে দেয়া হলো। তখন তো মোবাইল ছিলো খুবই দুর্লভ একটা জিনিস। কিন্তু মোবাইল দিয়ে কি হবে, রাহিমের সাথে তো আর কথা বলতে পারবে না। কারন সব সময় জেরিনের সামনে কেউ না কেউ থাকে। সবার সামনে নতুন বউ হয়ে কি জামাই এর সাথে কথা বলা যায়! এই যুগে হয়তো কথা বলে, তবে আগের যুগের মেয়েরা ছিলো অনেক বেশি লাজুক।

যাই হোক, রাহিম মনে মনে ভাবছে যে কথা না বলে যদি মোবাইলের মাধ্যমে চিঠি পাঠানো যায় তাহলে কেমন হবে!

এমন চিন্তা মাথায় আসতেই রাহিম ছাদে চলে যায় ওর বড় কম্পিউটারের ঘরে। সেখানে গিয়ে অনেক কিছু ভাবতে থাকে, এমন সময় রাহিমের চোখ পরে ছাদের টিভির এন্টেইনার দিকে। আগে তো সবাই এন্টেইনা লাগিয়েই টিভি দেখতো, তখনো ডিসের নাইল নামে কিছুই চালু হয়নি। তখন আবার রেডিও খুব ভালো চলতো। ঘরে ঘরে রেডিও ছিলো আর টিভি থাকতো পুরো এলাকায় মাত্র কয়েকজনের ঘরে।

রাহিম ভাবতে থাকলো যে রেডিও আর টিভি চালানোর জন্য এন্টেইনা লাগে। এই এন্টেইনাতে সিগনাল আসে বড় বড় টাওয়ার থেকে। সেই সব টাওয়ার থেকে পাঠানো হয় শব্দ তরঙ্গ বা কোনো ভিডিও। যদি কোনো ভাবে চিঠি পাঠানো যেতো মোবাইলে তাহলে এই এন্টেইনার মাধ্যমে! এটা কি করা সম্ভব! ভাবতে লাগলো রাহিম।

সারাদিন অনেক কিছু করলো রাহিম, কি কি করেছে জানেন? আস্তো একটা ভালো টিভি ভেঙ্গে টিভির ভেতরে কি কি আছে সেগুলো নিয়ে খুটি নাটি করেছে, আবার রাহিমের সখের রেডিও টা ও ভেঙ্গেছে, রেডিও ভেতরে কি কি আছে সেগুলো নিয়ে ও কিছু সময় খুটিনাটি করেছে।

রাহিমে আম্মু তো অনেক রেগে গেছে! টিভি বা রেডিও ভাঙ্গার জন্য না, রাহিম যে সকাল থেকে কিছুই খায়নি, সেই সকালে ছাদের রুম নাস্তা দিয়ে গিয়েছিলো, সেই নাস্তা টেবিলে সেই ভাবেই পরে আছে, আর এখন দুপুর হয়ে গেছে। রাহিমের আম্মু জোর করে নিজেরর হাতেই রাহিমকে খাইয়ে দিলো।

তারপর রাহিম নামাজ পড়ে আবার খুটি নাটি করতে শুরু করলো।
রাহিমের আম্মু জেরিনদের ঘরে গিয়ে জেরিনের কাছে রাহিমের নামে বিচার দেয়া শুরু করলো। এই জেরিন শোন, তুই বিয়ের পরে রাহিমকে আর কম্পিউটারের সামনেই যেতে দিবি না। সারা দিন কি করে ঐ বাক্সটা নিয়ে। আজকে আবার দেখলাম একটা ভালো টিভি আর রেডিও ভেঙ্গে কি জেনো করছে, শুধু তাই না, ছাদে যে টিভির এন্টেইনা ছিলো ওটা নিয়ে ও যেনো কি করছে, কোনো কিছু আর বাদ রাখলো না তোর জামাই, ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।
জেরিন রাহিমের আম্মুর কথা শুনছে আর মনে মনে ওকে বকা দিচ্ছে।

রাত প্রায় ১১ টা বাজে। জেরিন ওর নতুন মোবাইটার পেছনে কমল দিয়ে “TiyA+TotA” লিখছে। এমন সময় মোবাইলটা কেপে উঠলো। যেমনটা কেপে ওঠে মোবাইলে কোনো কল আসলে।

এতো রাতে জেরিনকে আবার কে কল দিলো! জেরিনের সামনেই ওর আব্বু আম্মু ভাই বসে আছে। জেরিন লুকিয়া লুকিয়া TiyA+TotA লিখছিলো। কারন যেদিন বিয়ে ঠিক করেছিলো সেই দিন দুপুরে যখন রাহিম আর জেরিন দুষ্টামি করছিলো তখন রাহিম জেরিনকে আদর করে টিয়া পাখি ডেকেছিলো আর জেরিন ও রাহিমকে তোতা পাখি নামে ডেকেছিলো।

যাই হোক, জেরিন ভেবেছিলো রাহিম ওকে মোবাইলে কল করেছে, এছাড়া অন্য আর কে কল করবে ওকে! কেউ তো ওর নাম্বারই জানে না। আর মোবাইল ই বা আছে কার কাছে!

মোবাইলের স্কিনের দিকে জেরিন তাকিয়ে দেখে কেউ ফোন করেনি। তবে মোবাইলের উপরে যে সিমের নেটয়ার্কের দাগ থাকে কয়েকটা, সেটার পাসেই একটা অদ্ভুত চিন্হ দেখা যাচ্ছে। চিন্হটা দেখতে অনেকেটা পৃথিবীর মতো আর ঐ পৃথিবী চিন্হের সাথে লেখা “1”
জেরিন কিছুই বুঝতে পারছে না। এমন সময় জেরিনের চোখ পরলো ওর মোবাইলে চিঠির খামের মতো একটা চিন্হ ভেষে উঠলো। আর মোবাইলের নিচে ডানে লেখা “Open” আর বামে লেখা “Close”

জেরিন না বুঝেই মোবাইলের বাটনগুলোর মধ্যে একেবারে উপরে call receive করার সবুজ বাটনটায় ক্লিক করলো আর সাথে সাথে জেরিনের মোবাইলে ভেষে উঠলো একটা লেখা। TiyA..,

জেরিন বুঝে গেছে এটা রাহিম ছাড়া আর কেউ হতে পারে না। কারন একমাত্র রাহিমই ওকে টিয়া বলে ডাকে আর কেউ না।

কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব! তবে সম্ভব হয়েছিলো, ভালোবাসার টানে। রাহিম ঐ এন্টেইনা দিয়ে একটা ইন্টারনেট জোন বানিয়েছিলো ওর বাড়ি ও আশে পাশের কিছু জায়গা জুড়ে। আর ইন্টারনেটে প্রথম কেউ কাউকে মেসেজ পাঠিয়েছিলো TiyA বলে। সেই TiyA ছিলো জেরিনেরই নাম যে নাম রাহিম ওকে দিয়েছিলো আদর করে।
এরপর আরো একটা চিঠির খাম ভেষে উঠলো জেরিনের মোবাইলের স্ক্রিনে। সেখানে লেখা, “1 ek bar Tiple . full stop hobe. 1 dui bar tiple , koma hobe. 2 ek bar tiple A hobe. 2 dui bar tiple B hobe.”

এভাবে লেখা ছিলো কিভাবে কোনো নাম্বার কতোবার টিপলে কোনো কোন ইংরেজি অক্ষর হবে। আর ২য় মেসেজটাই ছিলো ইন্টারনেটের প্রথম বাংলা ভাষাকে ইংরেজী অক্ষর দিয়ে প্রকাশ করা প্রথম মেসেজ।

জেরিন ও ছিলো খুব বুদ্ধিমতি মেয়ে, কারন সে রাহিমকে রিপ্লাই দিতে সক্ষম হয়েছিলো, জেরিন রাহিমকে রিপ্লাই দিয়েছিলো, “TotA.”

তারপর বিয়ের হবার আগে পর্যন্ত রাহিম আর জেরিন এভাবে মোবাইলে মেসেজ দিয়ে কথা বলতে থাকে যা ছিলো আজকের যুগের ইন্টারনেট আবিষ্কারের প্রথম পর্যায়।
এরপর রাহিম আর জেরিনের বিয়ে হয়ে গেলো। বিয়ের আগে রাহিমের আবিষ্কার করা প্রযুক্তিটা নিয়ে আরো গবেষনা করে আবিষ্কার করলো আজকের যুগের ইন্টারনেট যা ছাড়া আমরা একটা দিন ও চলতে পারি না।

দেখলেন তো ভালোবাসার টানের শক্তি কতো বেশি। তবে এই গল্পটা কাল্পনিক। এই গল্পে ইন্টারনের আবিষ্কারের যে ইতিহাস বলা হয়েছে সেটা ও কাল্পনিক। তবে এই গল্পে যে ভালোবাসার টানের শক্তিটা বোঝানো হয়েছে সেটা কিন্তু কাল্পনিক না। ভালোবাসার টান অনেক বড় একটা জিনিস, অনেক শক্তি অনেক ক্ষমতা আছে এই ভালোবাসার যদি সেটা সত্যিকারের ভালোবাসা হয়ে থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *